বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাতের জেরে বছরের শুরু থেকেই বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়ায় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আগাম প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। ভবিষ্যতে যেন অর্থের সংকটে না পড়তে হয়, তাই অনেক বড় কোম্পানি দ্রুত ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। সম্ভাব্য বাজার অস্থিরতা মোকাবেলায় প্রতিষ্ঠানগুলো আগেভাগেই প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহ করে রাখার চেষ্টা করছে। খবর এফটি।
বিশ্লেষকদের মতে, বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিতব্য যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরেও নীতিগত অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। তাই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়ার আগেই কোম্পানিগুলো নিজেদের নগদ প্রবাহ শক্তিশালী করতে এবং বিনিয়োগ ও পরিচালন ব্যয় নির্বিঘ্ন রাখতে অর্থ জোগাড়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাভাবিক সময়ে বড় কোম্পানিগুলো বাজারে বন্ড ছেড়ে ঋণ নেয়ার আগে কয়েকদিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়। তবে বর্তমান অস্থির প্রেক্ষাপটে সে ধারা বদলে গেছে। ব্যাংকারদের মতে, মার্কিন করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বাজারে সামান্য ইতিবাচক সংকেত পেলেই দ্রুত বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে ঋণ সংগ্রহ করছে। চলতি সপ্তাহে বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত মিলতেই এ প্রবণতা আরো জোরদার হয়েছে। ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় কোম্পানিগুলো দেরি না করে দ্রুত তহবিল জোগাড়ে মনোযোগী হয়ে উঠছে বলে জানা গেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরতেই করপোরেট ঋণ সংগ্রহে হঠাৎ গতি এসেছে। খনি শিল্পের জায়ান্ট গ্লেনকোর, মার্কেট মেকার সিটাডেল সিকিউরিটিজসহ মোট ১৬টি প্রতিষ্ঠান প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি ডলারের ‘ইনভেস্টমেন্ট গ্রেড’ বন্ড বিক্রি করেছে।
উল্লেখ্য, গত সপ্তাহের শেষ দিকে বাজারের অনিশ্চয়তার কারণে বন্ড ইস্যুর কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। কিন্তু নতুন সপ্তাহের শুরুতেই পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় করপোরেট বন্ড বিক্রি ফের বাড়তে দেখা গেছে।
জেপি মরগ্যানের ইনভেস্টমেন্ট গ্রেড ফাইন্যান্সিংয়ের গ্লোবাল কো-হেড জন সার্ভিসিয়া বলেন, ‘বর্তমান দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে বাজার টানা কয়েকদিন স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই প্রতিদিনের বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে ঋণ তোলার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।’
তিনি জানান, বাজার পরিস্থিতির সংবেদনশীলতা বোঝা যায় গত ১০ মার্চের ঘটনায়। সেদিন মার্কিন ইনভেস্টমেন্ট গ্রেড বন্ড বাজারে একদিনেই রেকর্ড ৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের বন্ড বিক্রি হয়। এর পেছনে ভূমিকা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ঘোষণার, যেখানে তিনি ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
এরপর বাজারে স্বল্প সময়ের জন্য ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়, আর সে সুযোগেই কোম্পানিগুলো বড় অংকের ঋণ সংগ্রহ করে নেয়।
টিডি সিকিউরিটিজের ইউএস করপোরেট সিন্ডিকেট প্রধান জিয়ান দায়েমি বলেন, মূল্যস্ফীতি এবং প্রবৃদ্ধির অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে কোম্পানিগুলো যত দ্রুত সম্ভব তহবিল নিশ্চিত করতে চাইছে। তার মতে, বাজারে এখন সুযোগ খুব কম। ইরান সংকটের পর থেকে হাতেগোনা কয়েক দিন মাত্র বাজার লেনদেনের জন্য অনুকূল ছিল। ঋণের খরচ বা সুদহার বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও এ হুড়োহুড়ি কমেনি।
ইনভেস্টমেন্ট গ্রেড কোম্পানিগুলোর ঋণের খরচ গত সোমবার পর্যন্ত সরকারি ঋণের চেয়ে দশমিক ৮৮ শতাংশ বেড়েছে। তবে ব্যাংকাররা বলছেন, এ হার এখনো গত জানুয়ারির সর্বনিম্ন হারের চেয়ে মাত্র দশমিক ১৫ শতাংশ বেশি।
ইউরোপের করপোরেট খাতেও তহবিল সংগ্রহে একই ধরনের তৎপরতা দেখা গেছে। যুদ্ধজনিত অর্থনৈতিক প্রভাব ও বেসরকারি খাতের ঋণের মান অবনমনের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও কোম্পানিগুলো দ্রুত বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ তুলছে।
ডয়চে ব্যাংকের হেলেন জলি জানান, পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় অনেক প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক বেশি সুদ দিতেও রাজি হচ্ছে, যাতে এখনই প্রয়োজনীয় তহবিল নিশ্চিত করা যায়। বিশেষ করে নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে নীতিগত পরিবর্তনের আশঙ্কা রয়েছে। অনেকের ধারণা, ভোটারদের আকৃষ্ট করতে রাজনীতিবিদরা এমন কিছু জনতুষ্টিমূলক নীতি নিতে পারেন, যা ব্যবসাবান্ধব নাও হতে পারে। এ আশঙ্কায় অনেক কোম্পানি এখনই তহবিল সংগ্রহ করছে।
বাজারের বর্তমান অস্থিরতা কেবল বৃহৎ কোম্পানিগুলোকেই নয়, বরং মাঝারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদেরও চাপের মুখে ফেলেছে। ইনভেস্টমেন্ট গ্রেড কোম্পানিগুলো উচ্চ সুদেও ঋণ নিতে আগ্রহী হওয়ায় বাজারে নগদ অর্থের সরবরাহ কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এছাড়া মার্কিন নির্বাচনের আগে ডলারের মানে সম্ভাব্য ওঠানামা ও বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের বিঘ্ন ঘটার ভয়ে কোম্পানিগুলো কাঁচামাল আমদানির জন্যও বড় অংকের এলসি বা ঋণপত্র খুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দ্রুত প্রশমিত না হয়, তবে ঋণের উচ্চ ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিকে মন্থর করে দিতে পারে।